ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেট

হারিয়ে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেট

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যর্থতার কাটাছেঁড়া করেছেন বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান ও সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ধবলধোলাই হয়েছে বাংলাদেশ। কেন এই ব্যর্থতা, সেটিই বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম। হারিয়ে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেট।

শেষ ম্যাচটা জিততে পারলে একটু হলেও সান্ত্বনা পেত বাংলাদেশ। দেরাদুনে কাল শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ১ রানে হেরে সেটিও হয়নি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা নিয়ে ফিরছে বাংলাদেশ। একটি দেশের ক্রিকেটকে বিচার করার আদর্শ সংস্করণ যদিও টি-টোয়েন্টি নয়, তবুও এটা দেশের ক্রিকেটের জন্য অবশ্যই বড় বার্তা। আজ আফগানদের বিপক্ষে বাজে খেলেছে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা যে সঙ্গী হবে না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।

কিন্তু আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ভরাডুবি কেন, কেন এই ব্যর্থতা? আইসিসিতে কর্মরত বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান ও সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম সেটি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর দৃষ্টি শুধু আফগানিস্তান সিরিজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সেটি নিবদ্ধ হয়েছে আরও গভীরে। আফগানদের বিপক্ষে ভরাডুবির কারণগুলো ১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কের চোখে দেখে নিন…

১. ঘুণে ধরা ঘরোয়া ক্রিকেট
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে কখনো প্লেয়ার বাই চয়েস করা হচ্ছে, কখনো সেটি উন্মুক্ত করা হয়। কখনো ভেন্যু-সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। নির্দিষ্ট ক্লাবকে সুবিধা দিতেই এসব করা হয় বলে অভিযোগ আছে। এসব করে ঘরোয়া ক্রিকেটটা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে! প্রিমিয়ার লিগ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট—কোথাও কি স্বচ্ছতা আছে? স্বচ্ছতা যারা নষ্ট করছে, তাদের কেউ কেউ নাকি জাতীয় দলের সঙ্গেও সম্পৃক্ত বলে শোনা যায়। এ চর্চাটাই সব জায়গায় চলে আসছে। অনুশীলনের সঙ্গে ম্যাচের অবশ্যই অনেক পার্থক্য আছে। অনুশীলন করেন খাঁচার ভেতর। খেলতে হয় খোলা মাঠে। অনুশীলনটা তাই হওয়া দরকার ভীষণ কঠিন, তাতে ম্যাচটা যেন সহজ হয়। আমাদের অনুশীলনটা এত সহজ হয়, ম্যাচ হয় অনেক কঠিন। ম্যাচে গিয়ে খেলোয়াড়েরা খেই হারিয়ে ফেলে। বিপিএল ছাড়া দেশে আর কোনো টি-টোয়েন্টি লিগ হয় না। বিপিএলে স্থানীয়দের সুযোগ যে অবারিত, সেটিও নয়। একাদশে ৪-৫ জন বিদেশি খেলোয়াড় থাকে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলার আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে যতটা প্রস্তুতি দরকার, সেটা নেই। সব মিলিয়ে প্রস্তুতি ছাড়াই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলতে যায় বাংলাদেশ। ফলে এখানে ধারাবাহিকতা নেই। নিদাহাস ট্রফিতে ভালো খেলার পর আফগানিস্তানের মতো দলের কাছে তিনটি ম্যাচ হেরে বসে দল।

২. সিনিয়র-জুনিয়রে অনেক পার্থক্য
দলে যে চার-পাঁচজন সিনিয়র খেলোয়াড় আছে, ক্রিকেটের তিন সংস্করণে এরাই নিয়মিত মুখ। ৯০ শতাংশ ম্যাচ এরাই খেলে। একেকজন খেলোয়াড় তৈরি হয় একেক স্টাইলে। এই স্টাইলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাকে তৈরি হতে হয়। সামঞ্জস্য করতে করতেই চার-পাঁচজন সিনিয়র এখন পরিপূর্ণ ক্রিকেটার। তাদের মতো ভালো খেলোয়াড়ের অভাবে ধারাবাহিকভাবে তিন সংস্করণে আমরা ভালো করতে পারছি না। সিনিয়র খেলোয়াড়দের আমরা এমনভাবে ব্যবহার করছি, এরা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্পই নেই। বলার মতো নতুন খেলোয়াড় উঠেও আসছে না। চার-পাঁচ সিনিয়র খেলোয়াড়কে এই জায়গায় আসতে লেগেছে ১২-১৩ বছর। পরের প্রজন্ম যারা আছে, যেমন সৌম্য-সাব্বির-মিরাজ, ওরাও সেভাবে মেলেও ধরতে পারছে না নিজেদের। ১২-১৩ বছর পরও সাকিবদের মতো সার্ভিস দিতে পারবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। দুটি প্রজন্মের মধ্যে অনেক পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় অশনিসংকেত।

৩. সংস্করণটা কি ঠিক ছিল?
এই সিরিজটা ওয়ানডে না কি টি-টোয়েন্টিতে খেলব সেটি বাছাই করার সুযোগ আমাদের হাতেই ছিল। আমরা বেছে নিয়েছি টি-টোয়েন্টি সংস্করণ। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে সব জানার পরও কেন এ সংস্করণ বেছে নিলাম? বোর্ডের পরিকল্পনার অভাবই এখানে ফুটে উঠেছে। কাদের সঙ্গে কোন সংস্করণে খেললে কী লাভ, সেটি তারা কেন বুঝবে না? বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগকে দায়ী করতেই হবে, সূচি তৈরির কাজটা যেহেতু তারা করে থাকে। আমরা কোচ নিয়ে অনেক কথাই বলেছি। জাতীয় দলে কোচিং করানোর তেমন কিছু থাকে না। কিছু ধাঁধা থাকে, সেগুলো সুন্দরভাবে মেলানোই হচ্ছে প্রধান কোচের কাজ। কোর্টনি ওয়ালশ এই দলে কাজ করছে শুধু বোলিংটা ভালো বোঝেন বলে। ওনাকে আমরা কখনো ভিভ রিচার্ডস কিংবা রিচি রিচার্ডসনের মতো ব্যাটিং করতে দেখিনি। তিনি ব্যাটিংয়ে ভালো পরামর্শ দেবেন, এটা আশা করা যায় না। গর্ডন গ্রিনিজের কাছেও আমরা বোলিংয়ের টিপস পেতাম না। আমাদের দলে যে ম্যানেজার আছে, তিনি কখনো নির্বাচক। নিশ্চিত, কখনো কখনো দলে কোচিংয়ের ভূমিকাও পালন করেন তিনি। ওয়ালশকে আপনি কিছু বলতে পারবেন না, তাকে দিয়ে আপনি ঠেকা কাজ চালাচ্ছেন। টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচিং স্টাফ বা খেলোয়াড়কে কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। কোনো সামাঞ্জস্য, জবাবদিহি নেই দলে।

৪. ‘হোমওয়ার্ক’ কি ঠিক ছিল?
রশিদ-নবী-মুজিব—এই সংস্করণে বিশ্বমানের খেলোয়াড়। কিন্তু কোনো খেলোয়াড়ই তো আর অতিমানব নয়। তিনটি ম্যাচ দেখে মনে হলো এদের বিপক্ষে ভালো কোনো ব্যাটিং পরিকল্পনা ছিল না। আমার কাছে জানতে চাইলে বলব, রশিদকে অফ স্পিনার ভেবেই খেলা উচিত ছিল। তাহলে অন্তত ওকে উইকেটগুলো দিতে হতো না। ৪ ওভারে অনায়াসে ২৫-৩০ রান তোলা যেত। বড় বড় ফাস্ট বোলারদের দেখেছি ২০-২৫ ওভার পরে গিয়ে তারা রিভার্স সুইং করত। রিভার্স সুইংয়ের বিপক্ষে খেলতে হলে একটি মুখস্থ কথা হচ্ছে এটাকে ইন সুইং ভেবে খেলো। আউট সুইং ছেড়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ইন সুইং ছাড়তে পারবেন না। ছেড়ে দিলে হয় এলবিডব্লু কিংবা বোল্ড হয়ে যাবেন। এই ভুলটা আমরা করেছি রশিদ খানের বিপক্ষে। এসিসিতে কাজ করার সময় ওর বেড়ে ওঠা কাছ থেকেই দেখেছি। তখন সে ৫০ শতাংশ বোলার ছিল। এখন সেটি ১০০ শতাংশ। নবীর বল খুব একটা ঘোরে না কিন্তু ভালো জায়গায় বোলিং করে। মুজিব যতটা লম্বা, ওর হাত দেখেও খেলা যায়। কতটুকু হোম ওয়ার্ক বা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম এই সিরিজের আগে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। সিরিজটা চলার সময় দেখলাম দলের ম্যানেজার, বিসিবি মিডিয়া কমিটির প্রধান, এমনকি বিসিবি সভাপতিও নানা মন্তব্য করছেন। এ ধরনের কথাবার্তা যখন সিরিজের মাঝে হয়, ওই দলের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। প্রথম ম্যাচটা হারের পর দলের শরীরী ভাষা দেখে মনে হয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট দলকে ঠিকভাবে উজ্জীবিত করতে পারেনি।

৫. হারিয়ে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি
দিনে দিনে কেমন যেন দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিটা হারিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেট সংস্কৃতি বলতে এটার ভ্যালুজ বা মানের কথা বলছি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেটি অনুসরণ করে। একটা ছেলে বাজে আম্পায়ারিংয়ের প্রতিবাদে ৪ বলে ৯২ রান দিয়ে দিচ্ছে। আম্পায়ারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ উঠছে, প্রিমিয়ার লিগে নানা ঝামেলা হচ্ছে, জাতীয় দলে স্পিরিটের অভাব দেখা দিচ্ছে। ছোট্ট ভূখণ্ডে ১৬ কোটি মানুষের বাস। সবাই খেলাটা অনুসরণ করে। ক্রিকেট সংস্কৃতিটা উন্নত রাখা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।

৬. পেশাদারি নিয়ে প্রশ্ন
অবশেষে হেড কোচ পেয়েছি, এটা বোর্ডের বড় কোনো সাফল্য নয়। কোচ নিয়োগ দেওয়াই তাদের কাজ। এবার দেখলাম একটা কোচ আনতে আরেকজনের সহায়তা নিতে হয়েছে। বোর্ডে যারা কোচ নির্বাচনের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। নইলে হুট করে কোচ চলে যেত না। হাথুরুসিংহে বছরে পাওনা ছুটির চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি ছুটি কাটাত না। পাইবাস কাজ করে চলে গিয়েছে অথচ তার সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল না! বোর্ডে যাঁরা এই দায়িত্বে আছেন, তাঁদের ক্রিকেটজ্ঞান আরও সমৃদ্ধ এবং আরও পেশাদার হওয়াটা জরুরি।

Related Articles

Close