ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেটবিশ্লেষণমন্তব্য

ক্যাপ্টেন, এই জাতি লইয়া আপনি কি করিবেন?

জান্নাতুন নাহার : ‘এত কিছু বুঝোতি হয় না মানুষরে, এত কিছু বুঝোলে ওরা আরও পাইয়ে বসে, আমাকে আমার মত ঝামেলা মিটাতি দে।’

তাসকিনের ক্যামেরায় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছেন মাশরাফি; সাথে রয়েছেন শুভাশীষ রায় ও এনামুল বিজয়। কি বোঝাতে গেলে মানুষ পেয়ে বসে? কি এমন বিষয় যা মাশরাফিকে এখনো বোঝাতে হয়?

ঘটনা বিপিএলের। চিটাগাং ভাইকিংস ও রংপুর রাইডার্সের মধ্যকার ম্যাচের। রংপুরের অধিনায়ক মাশরাফির দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন তরুণ পেসার শুভাশীষ।

২১ বলে চাই ৩৬ রান। ব্যাট করছিলেন মাশরাফি। ম্যাচের মোড় ঘুরে যাওয়ার মতো এমন টানটান উত্তেজনার মাঝে ১৭তম ওভারে বল করতে আসেন শুভাশীষ। নিজের চার নম্বর ডেলিভারিটি দিয়েছিলেন ইয়র্কার, যা ঠেকিয়ে দেন ব্যাটসম্যান মাশরাফি।

ঘটনা পরম্পরায় ব্যাটসম্যান-বোলার মাঠেই একদফা বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে এমনকি মাশরাফির দিকে তেড়েও যান শুভাশীষ। বোলার শুভাশীষের আচরণ এসময় যে মোটেই খেলোয়াড় সুলভ ছিলোনা, তা ভিডিওতে স্পষ্ট। যদিও পরিস্থিতি সামলে নেন মাঠের আম্পায়ার এবং শুভাশীষের সতীর্থরা।

টাইগার মাশরাফির প্রতি অপার শ্রদ্ধা ভালোবাসায় আপ্লুত ক্রিকেট পাগল এ জাতি কিন্তু ঘটনাটিকে দেখছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণে। ক্রিকেটের মত মনস্তাত্ত্বিক খেলায় স্লেজিং বলে যে কিছু একটা আছে তা আর সাধারণ দর্শকের মাথায় থাকেনি। মাঠের সেই উত্তাপে মুহূর্তে উত্তপ্ত করে তোলে সোশ্যাল মিডিয়াকে। মাশরাফির পক্ষ নিয়ে শূলে চড়ানো শুরু হয় শুভাশীষকে। স্ট্যাটাস আর ইভেন্টে ফেসবুক সয়লাব।

খেলার আলাপ যদিও মাঠেই ফুরিয়ে গেছে। প্রতিটি ম্যাচই আলাদা; তাতে লাগে নতুন প্রস্তুতি, নতুন পরিকল্পনা। চিটাগাং ভাইকিংস কিংবা রংপুর রাইডার্সের খেলোয়াড়দেরও তেমনটাই করবার কথা। কিন্তু সে যুক্তি এদেশের ক্রিকেট দর্শকরা বুঝবেন কি?

তাই আবারো এগিয়ে এসেছেন ক্যাপ্টেন মাশরাফি নিজেই। রাত ১০টায় ফেসবুক লাইভে আসেন। জানিয়ে দেন, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। শুভাশীষ ও তিনি নিজে, উভয়েই বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড়। তাই সম্মান শুধু তাকে দিলেই চলবে না।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনেও মাঠের ওই বিষয়টিকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ম্যাশ। ভেবেছিলেন স্যরি বললেই বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাবে, দর্শক-সমর্থকরা অনর্থক অনর্থ করবেন না। কিন্তু তার স্যরিতে কাজ হয়নি। লাইভে এসে মাশরাফি নিজেই ক্ষমা চাইলেন একাধিকবার, এমনকি শুভাশীষও ক্ষমা চেয়েছেন। তাহলে, ভাবছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে?

একমাত্র ক্রিকেট উপলক্ষেই দেশের সবাই একত্রিত হয়। তাই সেই একত্রিত দেশকে সামলানোর দায় কাঁধে তুলে নিয়ে আশ্বস্ত করা চেষ্টাও করেছেন মাশরাফি। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি আদৌ শান্ত হল কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। নোংরা, অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য নানা আঙ্গিকে চলছেই; যাতে এমনকি ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও কথা বলতে শুরু করেছেন অনেকেই।

মাঠের স্লেজিং মাঠেই রেখে এসে খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে আলাপ-রসিকতায় সম্পর্ক অটুট রাখলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দর্শকদের উত্তাপ থামতেই চাচ্ছে না। কখন, কোথায়, কিভাবে, কতখানি উত্তপ্ত হতে হয়, আর কেমন করে সে উত্তাপে ঘি ঢালতে হয়; কবে বুঝিবে এ জাতি?

মাঠের স্লেজিং মাঠেই রেখে এসে খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে আলাপ-রসিকতায় সম্পর্ক অটুট রাখলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দর্শকদের উত্তাপ থামতেই চাচ্ছে না। কখন, কোথায়, কিভাবে, কতখানি উত্তপ্ত হতে হয়, আর কেমন করে সে উত্তাপে ঘি ঢালতে হয়; কবে বুঝিবে এ জাতি? এই উত্তর দেওয়ারও কি কেউ আছে? এই জাতি লইয়া কি করিবেন মাশরাফি?

লেখক : ব্লগার

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close