ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেট

পুরনো গুরুর নতুন অভিজ্ঞতা

গর্ডন গ্রিনিজ যখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজনদের ক্রিকেট শেখান, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে তখন ফুটবলের রাজত্ব। এমনকি সে সময় ক্রিকেটই বাংলাদেশে ততটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। ক্যারিবীয় কোচকে তাই প্রতিনিয়ত দিয়ে যেতে হয় অগ্নিপরীক্ষা। বাংলাদেশ দলকে প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার মিশন নিয়েই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গ্রিনিজ।

বাংলাদেশকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখেছিলেন ক্যারিবীয় এই কোচ। গ্রিনিজের তত্ত্বাবধানেই আইসিসি ট্রফি জয় করে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। এমন সাফল্যে পুলকিত তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার গ্রিনিজকে আপন করে নেয়। তাকে দেওয়া হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। যদিও সুসম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। মুখ ভার করেই বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। এরপর সময় পাড়ি দিয়েছে অনেকটা পথ। বাংলাদেশের ক্রিকেট দাঁড়িয়েছে শক্ত ভীতের ওপর।

দিন, সময় নতুন হয়ে ধরা দিলেও এমন একজন বন্ধুকে ভোলেনি বাংলাদেশের ক্রিকেট। পুরনো শিক্ষককে গেল ১৪ মে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সম্মাননা হিসেবে হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ টাকা। আর ১৬ মে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। এদিন বিসিবির পক্ষ থেকে গ্রিনিজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্মারক। পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে।

অগ্রজদের সাবেক গুরুকে নিজেদের স্বাক্ষরিত জার্সি, ক্যাপ ও ফুল দিয়ে দলের পক্ষ থেকে সম্মান-ভালোবাসা জানিয়েছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ভীত গড়ে দিয়ে যাওয়া দেশের ক্রিকেটারদের মাঝে হাজির হতে পেরে গ্রিনিজও উচ্ছ্বসিত। তবে বাংলাদেশের খেলার খবর যে রাখা হয় না, সেটা তার কথা শুনে বোঝা গেল। বুধবার বিকেলে একাডেমি মাঠে জাতীয় দলের প্রাথমিক ক্যাম্পের ২৯ ক্রিকেটারের সঙ্গে কুশলাদি করতে গিয়ে প্রশ্ন করলেন; তোমাদের মধ্যে টপ অর্ডারে কে ব্যাটিং করে? তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকাররা হাত উঁচিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দেন।

এরপরই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা কিছু মন্ত্র মাশরাফি, তামিম, মুশফিকদের উদ্দেশে বলতে থাকেন গ্রিনিজ। সাবেক এই ক্যারিবীয় ওপেনার বলেন, ‘তোমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত যেখানেই খেলতে যাও; তোমাদের জন্য শুভ কামনা। সবচেয়ে ভালো উপদেশ আমি যেটা দিতে পারি, এটা নিশ্চিত করবে যে, তুমি নিজের খেলার প্রতি ফোকাসড ও মনোযোগী। এতে তুমি লাভবান হবে। শুরুতে অনেক আক্রমণাত্মক ও হিরো হওয়ার চেষ্টা করো না।’

তামিম-সৌম্য তাদের ব্যাটিং অর্ডারের কথা জানানোর পর গ্রিনিজ বলেন, ‘তোমরা অনেক সময় ব্যাটিং করতে পারবে এবং রান করবে। যা দলকে ভালো স্কোর পেতে সাহায্য করবে। ওয়ানডেতে মাঝে মাঝে নিচে ব্যাটিং করলে ভালো। দলের ভারসাম্য তৈরি হয়। অবশ্যই ভালো শুরু যেকোনো দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্র্যাকটিস হার্ড, প্র্যাকটিস ওয়েল। আশা করি, বাংলাদেশের জন্য সাফল্য নিয়ে আসবে। শুভ কামনা তোমাদের জন্য।

বাংলাদেশ দলের অনেক ক্রিকেটারই আছেন, যারা প্রথমবারের মতো গ্রিনিজকে দেখলেন। এমনকি গ্রিনিজ সম্পর্কে অনেকের তেমন ধারণাও ছিল না। সাবেক কোচকে সামনে পেয়ে তাই উচ্ছ্বসিত তরুণ ক্রিকেটাররা। তরুণ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, ‘যখন উনি কোচ ছিলেন, তখন আমি অনেক ছোট। আইসিসি ট্রফির সময় আমার বয়স তিন বছর ছিল। উনার কথা শুনেছি। উনি বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন। সেদিন শুনলাম, তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। এরপর অনুষ্ঠান হলো।’

এমন একজন কিংবদন্তির সঙ্গে কথা বলার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মিরাজ বলেন, ‘আমাদের সাথে কথা বললেন। কারণ আমাদের বেশির ভাগ ক্রিকেটারের সঙ্গে তার পরিচয় নেই। যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তারা অবসর নিয়ে নিয়েছেন। এখন শুধু হাই-হ্যালো হলো। অবশ্যই ভালো লাগছে। তিনি কিংবদন্তি, বাংলাদেশের কোচ ছিলেন। উনি বললেন, কষ্ট করতে হবে, হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে, এটা করলে ভালো হবে।’

বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি বিশেষ ভালোলাগা আছে গর্ডন গ্রিনিজের। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের দিনই বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট আমার হৃদয়ে।’ স্মৃতি বিজড়িত সেই দিনের কথা মনে করে আপ্লুত হয়ে পড়া গ্রিনিজ বুধবার মিরপুর স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে বলে গেলেন, ‘আবারও আসব বাংলাদেশে। এখানেও (মিরপুর স্টেডিয়াম) আসব। বাংলাদেশ তো আমার নিজের দেশই।’ তিনি বাংলাদেশরই নাগরিক। তাই এবার বাংলাদেশ ছাড়ার আগে নতুন অভিজ্ঞতা সাথে করে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাসপোর্টটাও নবায়ন করে যাবেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সত্যিকারের এই বন্ধু।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close