ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেটবিশ্লেষণ

তাসকিনের বিয়ে ও আমাদের মানসিকতা

আমরা কেন কুরুচির পরিচয় দিচ্ছি? হটাৎ কইে বাংলাদেশের আলোচিত ব্যক্তি হয়ে উঠলেন তাসকিন আহমেদ! কারণটা নিশ্চয়ই জানেন। জাতীয় দলের এই পেসার সদ্যই বিয়ে করেছেন। তাই ৩১ অক্টোবর রাতেই খবরের শিরোনামে উঠে এলেন তিনি। টিভির স্ক্রলে তাসকিন, অনলাইন পোর্টালের উপরে তাসকিন, পত্রিকার পাতায় তাসকিন এবং যথারীতি ফেইসবুকে তাসকিন!

একজন খেলোয়াড়ই শুধু নয়, যে কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যখন-তখন বিয়ে করতেই পারেন। নাও করতে পারেন। সেটা তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেলিব্রেটি হলে বিয়ের খবর মিডিয়ায় ফলাও করে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যেভাবে ট্রল করা হচ্ছে তাসকিনকে নিয়ে, ছোঁড়া হচ্ছে নিন্দার তীর, প্রয়োগ করা হচ্ছে কটু ও অশ্লীল বাক্য; তা ভাষার হরফে প্রকাশের অযোগ্য। সুস্থ মস্তিস্কের কারও পক্ষে এটা মেনে নেয়া কঠিন! নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এক-আধটু নির্দোষ মজা করুন ভালো কথা, তাই বলে এভাবে নোংরামির আশ্রয় নিতে হবে?

গড্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে যেন তাসকিনকে নিয়ে পোষ্ট দিতেই হবে বলে কেউ দিব্যি দিয়েছে! অবশ্য সবাই যে বিষয়টি খারাপভাবে দেখছেন, তা নয়। সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ দারুণসব যুক্তি দিয়ে মেধা ও সুরুচির পরিচয় দিয়েছেন। এমনও অনেকে আছেন, যাঁরা হালকা ফান করেছেন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। অনেকটা সাপের গুহায় হাত দিয়ে সাপ ধরা কিংবা নোংরা পরিস্কার করতে গিয়ে নিজেই ময়লায় নেমে যাওয়ার মতো ব্যাপার। এরকম ব্যতিক্রমী প্রয়াস যাঁদের, তাঁদেরকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খুবই বাজে খেলেছে বাংলাদেশ। তাসকিন আহমেদ বল হাতে করেছেন আরও খারাপ। সেখানে যদি ভালো করতো বাংলাদেশ, তাসকিন পারফরম্যান্সের আলোয় উদ্ভাসিত হতেন; তবে হয়তো সবাই তাঁর এই বিয়ে নিয়ে ধন্য ধন্য রব তুলতেন!

কিন্তু দল এবং তাসকিন নিজে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই বোধহয় এতটা নোংরামি! নিজের ভেতরের কুৎসিত সত্ত্বাকে বের করে আনা! আচ্ছ্বা, এটাই কী অনেকে ভেবেছেন যে, দলের খারাপ সময় গেছে বলে তাসকিনরা মনভার করে চেহারাকে পাঁচের মতো বানিয়ে দেশে ফিরবেন! লোক দেখানোর জন্য দুদিন দরজা বন্ধ করে কাঁদবেন! জীবনের অপরিহার্যতা থেকে আপাতত দুরে সরে যাবেন! তাতে যদি সমস্যার সমাধান মিলতো, এবং হারগুলো জয়ে রুপান্তরিত হতো; তবে নিশ্চিতভাবেই আমরা সবাই সমস্বরে ওই দাবীই তুলতাম!

নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি, তাসকিনের অভিভাবকরা কী বিয়ের তারিখটা আগেই ঠিক করেছিলেন, নাকি তাসকিন দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার পর কোনো ঘটনার অনিবার্যতায় তা হটাৎ করেই চুড়ান্ত করা হয়েছে। যাই ঘটুক না কেন, ব্যাপারটাতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। বরং সাহসী সিদ্ধান্ত বলেই প্রশংসা করা যায়। যদি আগে থেকে ঠিক করা সিদ্ধান্ত হয়, তবে দল ও তাসকিন নিজে খারাপ করার পরও সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে দৃড়তা দেখানোকে স্বাগতম। আর যদি দল ও তাসকিনের অমন বেহাল দশার পর অনূপ্রেরণার জন্য হটাৎ করে বিয়ের আয়োজন হয়; তবুও ধন্যবাদ প্রাপ্য।

‘এই পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর। অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ স্কুল জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাটি কী আমরা পড়েছি শুধু পরীক্ষায় কয়টা নাম্বার পাওয়ার জন্য? এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এত দিনেও অনুধাবন করতে পারবো না? তাহলে শিক্ষা অর্জনের পর সার্টিফিকেটের বোঝা বয়ে চলা নিরর্থক কীনা, প্রশ্ন উঠতেই পারে।

খারাপ সময়ের বাতাবরণে বিপর্যস্ত তাসকিন তাঁর প্রিয় নারীর আলিঙ্গনে উজ্জীবিত হবেন, নতুন করে স্বপ্ন বুনবেন এগিয়ে যাওয়ার যা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই লাভ; এমন চিন্তাই তো করার কথা ছিল। অথচ কীনা আমরা…!

তাসকিন যাঁকে বিয়ে করেছেন, সেই নাঈমা তাঁর অনেক দিনের পূর্ব পরিচিত এবং ভার্সিটি জীবনের বন্ধু। তার মানে এখানে আমরা দেখতে পাই ভালোবাসার আকাঙ্খিত পরিনতির জয়গান! কী সুন্দর ঘটনা! এর আগে মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকরা যে ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ঘর বেঁধেছেন; তাতে আমরা দেখেছি তাঁদের পারফরম্যান্সে কতটা উন্নতি হয়েছে। তাঁরা কেমন দৃড় ও থিতু হয়েছেন। নিশ্চয়ই নামের মতো কাজেও স্ত্রীরা স্বামীর সুখ-দূঃখের ভাগ নিয়েছেন সমানভাবে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট জেতার পর সাকিবের কথা শুনেছেন তো, স্ত্রী ফোন করে কীভাবে তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছে। ভবিষ্যতে তাসকিনের ক্ষেত্রেও যেন তাই হয়, এদেশের সত্যিকার ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত সেটাই।

এই পৃথিবীতে ভালোবাসার শক্তি অনেক। আমি, আপনি সর্বোপরি আমরা তো কারও না কারও ভালোবাসারই বাই পোডাক্ট, নাকি! আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও আছে আমাদের হৃদয়ে দারুণ ভালোবাসা। কত কাজ-টাজ ফেলে মনের খোরাক মেটানোর জন্য আমরা সাকিব-তামিমদের খেলা দেখতে বসে যাই। তো সেই দলের একজন যখন জীবনের আনন্দময় ঘটনার সূত্রপাত করলেন, কেন ‘এই সময়ে না করলেই নয়’, ‘এটা উচিত হয় নি’… এসব ধুয়ো তুলে তাঁর মন খারাপের কারণ হবো আমরা?

কেউ দেখতে সুন্দর নাকি বাজে, এসব তুচ্ছ ব্যাপারে নাক গলিয়ে নিজের মানসিকতা আর অরুচির আরেক নগ্ন বহিঃপ্রকাশও আমরা ঘটিয়ে ফেলি সচরাচর, মনের অজান্তে! সৌন্দর্য ব্যাপারটি তো পুরোটাই আপেক্ষিক। আরেকজন তাঁর চোখে যা দেখছেন, বিশেষ করে ভালোবাসার দৃষ্টিতে; আমি আপনি তা কোনোভাবেই অনুধাবন করতে পারবো না। তাহলে কেন অন্যের সৌন্দর্য আর তাঁর পছন্দের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমরা হীনতার পরিচয় দিই?

এভাবে একবার ভেবে দেখুন তো- নিজের সৌন্দর্য নির্ধারনের ক্ষমতা যদি বিধাতা মানুষের হাতে দিতেন, তবে এই পৃথিবীতে সবাই নিশ্চয় অনিন্দ্যসুন্দর হয়েই জন্মাতেন। তখন সুন্দর-অসুন্দর ব্যাপারটিই আর থাকতো না! আমাদের উপলব্ধি আর দৃষ্টিভঙ্গির বড় একটা জগতই তাহলে থেকে যেত অনাবিস্কৃত। সুন্দর-খারাপ কিংবা গায়ের রং দিয়ে যাঁরা মানুষকে বিবেচনা করেন এবং অন্যের ব্যক্তিগত পছন্দ ও ভালোলাগা নিয়ে কটু কথা বলেন; তাঁরা আর যাই হোক সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী নন বলে তাঁদের জন্য করুণা ছাড়া কিছু নেই।

যত যাই হোক, দিন শেষে অন্য আট দশটা খেলার মতো ক্রিকেটও একটা খেলাই। তবে বিশেষত্ব আছে অনেক। বলা হয়ে থাকে এটা ভদ্রলোকের খেলা! তাহলে সমর্থকরা অভদ্র হবেন কোন দু:খে! অনেক সংস্করণ ক্রিকেটের, ফল নির্ধারিত হয় দুইভাবে এবং নিয়মকানুন ও রেকর্ডপত্রের তলিকাও বিশাল যা বিস্ময়কর। অন্য দিক থেকে দেখলে, জীবনও যেন ক্রিকেটেরই প্রতিচ্ছবি! ব্যাটসম্যানের কতভাবে আউট হওয়াকে জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

ক্রিকেট হোক আর যাই হোক, খেলোয়াড়দের কাছে তাঁর ব্যক্তি জীবন ও পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ন। ২০১৫ সালে যে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল, সেবার এবি ডি ভিলিয়ার্স খেলেননি কেন মনে আছে? সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য। ক্রিকেট-ফুটবলে এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে।

এই তো প্রোটিয়াদের সঙ্গে যে টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম নিয়েছেন সাকিব আল হাসান; মুখে না বললেও সেখানে কিন্তু নিজের পরিবারকে বাড়তি কিছু সময় দেয়ার একটা ব্যাপার ছিলই। এবছর সম্ভবত, আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শুরুর আগে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা শুনে হটাৎ করে দেশে ফিরে এসেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তূজা। প্রিয় মানুষটা দ্রুত সেরে উঠেছেন বলে আবার দলের সঙ্গে যোগ দেন ম্যাশ। ভালোবাসা শুধু স্ত্রীর জন্য নয়, মা-বাবার জন্য এবং তাঁদের কথা রাখার জন্যও অনেক খেলোয়াড় ক্যারিয়ারে ঝুঁকি নিয়েছেন, এরকম উদাহরণও অনেক আছে।

খেলোয়াড়দের মাঠের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, সমালোচনা করাও দোষের কিছু নয়। এমনকি কোনো খেলোয়াড়ের নৈতিক স্থলন ঘটলে কিংবা দেশ ও জাতীর জন্য ক্ষতিকারক কিছু করলে সেটাতে একটা অবস্থান নেয়া যায়, প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু তাঁর জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা ব্যঙ্গ করা আর যাই হাক সুরুচির পরিচয় বহন করে না।

লেখার শুরুতে যে প্রশ্নটা করা হয়েছে ওটা খুবই তুচ্ছ একটা প্রশ্ন! এবং আসলে কোনো প্রশ্নই না! চিরন্তন সত্য বিষয়ে তো প্রশ্নই থাকতে পারে না। কোনোভাবেই ক্রিকেটের জন্য জীবন নয়; বরং জীবনের ছোট্ট একটা অনুসঙ্গ ক্রিকেট।

সুখ, দূঃখ আর আনন্দ-বেদনা নিয়ে জীবন নাটকের নাট্যমঞ্চে বিশ্ববিধাতার অদৃশ্য ইঙ্গিতে আমরা সবাই কী নিপুন অভিনয় করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত! সেখানে বিনোদনের বড় একটা অংশ জুড়ে খেলাধুলা। বাংলাদেশের জন্য যা ক্রিকেট।

তো আমাদের সেই ক্রিকেট দলের একজন ভালোবাসায় জড়ানো নতুন ইনিংস শুরু করেছেন। এই আনন্দের ক্ষণে দল আর তাঁর সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে আমরা যদি ‘সাবাস’ বলে অভিনন্দন জানাতে নাও পারি সমস্যা নেই; অন্তত কটু কথা ও নিন্দা থেকে তো বিরত থাকতে পারি, নাকি?

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close