ক্রিকেটবাংলাদেশ ক্রিকেটসাক্ষাৎকার

আমার মতো ভুল করো না : আশরাফুল

আশরাফুল, ব্যক্তিগত ইন্টারভিউ হবে। প্রথমেই বলেন, সাড়ে তিন বছর পর ফেরার ওই সময়টায় ঠিক কেমন লাগছিলো?

থ্রিলড। এটা আসলে ঠিক বলে বোঝানো খুব কঠিন। আমি সাড়ে তিন বছর ধরে এই মুহুর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এই পুরোটা সময় কল্পনা করেছি, ফেরার দিনটায় কী করবো। কিভাবে মাঠে ঢুকবো, কিভাবে ব্যাট ধরবো। সময়টা সামনে এসে গেলো যখন, তখন আসলেই ঘোরে ছিলাম।

অনেকটা কী সেই ক্রিকেট শুরু করার মতোই অনুভূতি?

থ্রিলের দিক থেকে সেরকম। তবে শুরুর সময়ে তো শুধু এনজয় করাটাই একমাত্র চিন্তা ছিলো। তখন আর কিছু নিয়ে ভাবিনি। এখন এসে অনেক চিন্তা ছিলো মাথায়। আমি জানতাম, অনেকে ফলো করছেন। আবার লাকিও যে, একটা নতুন ছেলের মতো অপরিচিত জগতে দাড়াতে হয়নি আমাকে। আমি এই খেলাটা পারি, এই খেলাটা খেলেছি। এই ছেলেদের চিনি। আমাকে সবাই চেনে। এটা তো একটা বড় পার্থক্য।

সতীর্থদের প্রতিক্রিয়াটা কী ছিলো? এতোদিন পর ফিরলে তো এই ওয়েলকাম পাওয়া বা না পাওয়া একটা ইস্যু থাকে।

এটা আপনি ওদেরও জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমি যেদিন দলের সাথে যোগ দিলাম, সবাই বললো, ভাই আপনাকে খুব মিস করেছি। আমার ক্রিকেট তো কিছুটা আছেই। আমি খেলার সময় চেষ্টা করি, সবাইকে নিয়ে মজা করতে। সেটা ওরা বললো, নাকি খুব মিস করতো। আমার একটা সুবিধা হয়েছে যে, এনসিএল দিয়ে ফিরেছি। এখানে ঢাকা মেট্রোর হয়ে খেলছি তো অনেক বছর ধরে। ফলে দলটা পরিচিত, এই খেলোয়াড়রা প্রায় সবাই আমার সামনে শুরু করেছে। ফলে নিজের পরিবারে ফেরার মতো একটা ব্যাপার ছিলো।

নিজেকে নিয়ে কী কনফিউশন ছিলো? পারবো কি না, এতো দিন পর।

ঠিক কনফিউশণ না। এক ধরণের চাপ ছিলো নিজের থেকে। অনেক প্র্যাকটিস করেছি, অনেক ফিটনেস ট্রেনিং করেছি। কিন্তু মাঠে খেলা। একটা চাপ তো ছিলোই। আর একটা ব্যাপার ছিলো, মানসিক ও শারীরিকভাবে আমি এই সময় খেলার জন্য খুব প্রস্তুত থাকতে পারিনি। আব্বা মারা গেলেন, আমি বাবা হলাম…

হ্যা, আপনার জন্য ওই সময়টা তো নানারকম উথালপাতাল ছিলো।

হ্যা, প্রথম মেয়ে হলো। সে আনন্দ ফুরাতে না ফুরাতেই আব্বা চলে গেলেন। আমার জন্য এটা বিরাট শক ছিলো। বাবা মারা যাওয়া যে কারো জন্য ধাক্কা। কিন্তু আমার আব্বা আমার প্রতিটা খারাপ সময়ে আমার পাশে থাকা একজন মানুষ। আমার মাঠে ফেরাটা দেখতে পারলে উনিই সবচেয়ে আনন্দ পেতেন। সেটা হলো না।

আপনার বাবা তো আপনার খেলার সার্বক্ষনিক ভক্ত ছিলেন, কাছে কাছে থাকতেন।

হ্যা। দেখেন, আব্বার কিন্তু নিজের একটা পরিচয় ছিলো। আব্বা ১৪ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। ওনার এলাকায় ওনাকে আমার পরিচয় দিতে হয় না। কিন্তু উনি সবসময় বলতেন, আমি আশরাফুলের বাবা। উনি সব ছেড়ে আমাকে সাপোর্ট করে গেছেন। অনেক বড় মিস ওনাকে হারানোটা।

আবার খেলায় ফিরি। ফিরে যে ক্রিকেট খেললেন, সেটা কী ঠিক আছে?

আমি মনে করি ঠিক আছে। আমি রান করেছি ২৬ আর ৪। তবে ব্যাটসম্যান হিসেবে আমি টের পাই, যেমন আশা করেছিলাম, সেরকম শেপে আছি। অস্বস্তি লাগেনি।

জাতীয় দলে ফেরার ব্যাপারে তো এখনও দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা আছে।

হ্যা। আমার মনে হয়, এটা ঠিকই আছে। আমি এটাতে একমত। কারণ, আমি ফেরার পর রাতারাতি তো জাতীয় দলে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও চান্স পেতাম না। আমাকে প্রমাণ করতে হবে নিজেকে। সে জন্য দুই বছর সময় তো লাগবে। সেই সময়টা পার করেই বিবেচিত হওয়া উচিত। এটা তো একটা আইনি প্রক্রিয়া। আমি তো একবার এই প্রক্রিয়ার ঢোকার পর থেকে সবসময় আইনের প্রতিই সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধা দেখিয়েছি। ফলে আমার জন্য কিছু সহজ করে দেওয়া হোক, সেটা চাইনি।

বিপিএলও তো খেলতে পারবেন না দুই বছর।

খেলতে পারলে হয়তো আরেকটু এক্সপোজারে থাকতাম। ওখানে বিদেশী ক্রিকেটাররা খেলে। তবে না পারাতেও খুব ক্ষতি হয়নি। ঘরোয়া অন্যান্য টূর্নামেন্ট তো আছেই। আমি নিজেকে সেখানে প্রমাণের চেষ্টা করবো।

আশরাফুল, এই প্রমাণ করার কথা ধরে বলি। আসলেই কী আপনি আবারও জাতীয় দলে ফিরতে পারবেন? সে সময় আছে?

আমি জানি, কাজটা খুব কঠিন। আমাদের দেশে তো প্রায় অসম্ভব। এখানে তিরিশের পর নতুন করে দলে আসাই কঠিন। রুবেল (মোশাররফ রুবেল) এলো, আবার বাদও পড়লো। তারপরও আমি চ্যালেঞ্জটা নিচ্ছি। জাতীয় দলে আসতে পারবোই, তা বলছি না। আমি আসার জন্য চেষ্টাটা চালাবো।

আবার এই লেভেলে খেলতে আপনাতে অতীত পুরোটা ভুলতে হবে। সেটা কী সম্ভব?

একদিন থেকে তো একটা বিচার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলাম, ফলে ব্যাপারটা অতীতই হয়ে যাওয়ার কথা। ভুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছু তো থেকেই যায়। সব কি আর ভুলতে পারবো!

আপনাকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায় বা যাবে, এটা টের পান?

অবশ্যই। এই প্রশ্ন আমি না মারা যাওয়া অবদি থাকবে। মানুষ জানতে চাইবে, কী কী করেছিলাম। কেনো করেছিলাম। যদিও আমি সব বলে দিয়েছি, আমি কিচ্ছু লুকাইনি। তারপরও লোকেদের প্রশ্ন থাকবে। আমাকে নিয়ে সন্দেহ থাকবে। এখন আমাকেই সততা দিয়ে যতোটা সম্ভব এই প্রশ্ন দূর করতে হবে।

আফসোস হয় না? যদি এই কাজটা না করতাম…

আফসোস। আফসোসই তো হয়। যদি এই ভুল না করতাম, আজও হয়তো দলে থাকতাম। আগামীকাল হয়তো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নামতাম। যখন ঘটনাটা ঘটালাম, সে সময়ও আমার ফর্ম ভালো ছিলো। আফসোস তো থাকবেই। তবে আবার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি ভুল করেছি, অন্যায় করেছি; তিনি সাঁজা দিয়েছেন। না হলে তো ন্যায় বলে কিছু থাকে না।

এখন যারা তরুন, তাদেরও তো এরকম ভুল করার ভয় থাকে। তাদেরকে কী বলেন?

আমি তো গত তিন বছর ধরে এদের সুযোগ পেলেই বলি, এই অসততা জীবনে করো না। আমাকে দেখে শেখো। আজকের শর্টার ফরম্যাটের ক্রিকেটের দিনে, এইসব প্রস্তাব আরও বেশী বেশী আসবে। সহজে ধনী হওয়ার প্রস্তাব আসবে। এটাকে ‘না’ বলতে পারতে হবে। আমি পারিনি। আমি এদের বলি, আমার মতো কিছু করলে পরিণতি এর চেয়েও খারাপ হতে পারে। আমার ভাগ্য ভালো। তাই সাড়ে তিন বছর পর ক্রিকেটে ফিরতে পেরেছি। তোমরা কেউ অসততা করলে, এই সুযোগটাও পাবে না হয়তো। কিছু প্রস্তাব পেলে যেমন নিয়ম আছে, তেমন করে সবাইকে জানাও এবং আমাদের উদাহরণটা মাথায় রাখো। মনে রাখতে হবে, খেলায় অসততার জায়গা নেই।-খেলাধুলা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close