ফুটবল

তার অপরাধ তিনি বাংলাদেশি

২০০৬ সালে বড় বিপদেই পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। সে সময় টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের জন্য বাংলাদেশকে চার হাজার ডলার অনুদান দিত এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনস (এএফসি)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টাকাটা হাত পেতে নিলেও ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’ হিসেবে কাউকে নিয়োগ দিতে পারছিল না বাফুফে। এমন একটা সময় বাংলাদেশের ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’কে কুয়ালালামপুরে নিজেদের প্রধান কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানায় এএফসি। বাফুফের বিপদ ছিল সেটিই। যেখানে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরই নেই, সেখানে কাকে কুয়ালালামপুর পাঠাবে তারা। এদিকে ধরা পড়ে গেলে যে চার হাজার ডলারের অনুদানটিই বাতিল হয়ে যাবে!

দেশের ফুটবল উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারলেও বিপদের সময় ঠিকই নিজেদের মুখ বাঁচাতে সিদ্ধহস্ত ফুটবল-কর্তারা। তাঁরা খুঁজে পেলেন মারুফুল হককে। তিনি তখন বুয়েটের শারীরিক শিক্ষা বিভাগে চাকরি করেন, বিভিন্ন ক্লাবে টুকটাক কোচ হিসেবে কাজ করেন। তবে বাফুফে কর্তারা জানতেন, এই মারুফুলের ফুটবল-জ্ঞান অসাধারণ। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের প্রেজেন্টেশনটা বেশ ভালোভাবেই দিতে পারবেন তিনি। কিন্তু মারুফুল কেন সেই কাজ করবেন? বাফুফের কর্মকর্তারা গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে তাঁকে কুয়ালালামপুরে পাঠালেন, ‘ভাই, তোমার হাতেই যে দেশের, বাফুফের ইজ্জত। আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো।’

মারুফুল প্রেজেন্টেশনটা দিয়েছিলেন দুর্দান্তই। এমনই দুর্দান্ত যে এএফসির হলরুম প্রকম্পিত হয়েছিল তালিতে। এশিয়ার সেরা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সেই প্রেজেন্টেশন দেখে অবাক—সোজা বলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ তো ঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।

মারুফুল যে প্রেজেন্টেশনটা বানিয়েছিলেন সেদিন, সেটি তো তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল। কুয়ালালামপুরের সেই অনুষ্ঠানে তিনি নিজে বাংলাদেশের ‘সাজানো’ প্রতিনিধি হলেও মানুষটা তো তিনি ছিলেন ‘খাঁটি’ আর ‘যোগ্য’। বাফুফে সেই প্রেজেন্টেশনটা যদি একটু নিজেরা খতিয়ে দেখত, তাহলে এ দেশের ফুটবলের হয়তো অনেক কিছুই পাল্টে দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য তো ছিল চার হাজার ডলারের অনুদান রক্ষা করা। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে ভাবার সময় তাদের কোথায়?

এই ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’ পদে এখন বাফুফেতে একজন আছেন। তিনি একজন ব্রিটিশ। নাম পল স্মলি। বছর দেড়েক আড়ে বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএসজেএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ফুটবল: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে স্মলি দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা দিয়েছিলেন একটি প্রেজেন্টেশনে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মারুফুল হক। লক্ষ করলেন, ২০০৬ সালে তিনি এএফসিতে যে প্রেজেন্টেশনটি দিয়েছিলেন, তার অনেক কিছুই স্মলিরটায় আছে। এই প্রতিবেদকের কাছে আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন ,‘১০ বছর আগে আমি কুয়ালালামপুরে একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলাম। ফেডারেশনকেও সেই পরিকল্পনাটা দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা পাত্তাই দিল না। আমি বাংলাদেশি বলেই হয়তো পাত্তা পেলাম না।’

মারুফুল নিজেকে গত বছরে অনেকটা পথ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি এখন উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেই তিনি একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্স কোচ। কিন্তু বাফুফে তাঁকে কাজে লাগায়নি। না নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরিতে, না কোচ তৈরিতে। ১০ হাজার ডলার (খাতাপত্রের হিসাবে) বেতন দিয়ে ব্রিটিশ টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মারুফুল কোচিং করিয়ে যাচ্ছেন ঘরোয়া ফুটবলে।

২০১৫ সালের দিকে আবারও বিপদে পড়েই মারুফুলের কাছে গিয়েছিল বাফুফে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ঠিক আগে দিয়ে কোচশূন্য হয়ে পড়েছিল জাতীয় ফুটবল দল। ডাচ লোডভিক ডি ক্রুইফকে সরিয়ে দেওয়ার পর ইতালীয় কোচ ফাবিও লোপেজও বেশি দিন টিকতে পারেননি। কেরালার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তাই জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় মারুফুলের হাতে। তিনি সফল হননি। আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের কাছে হেরে প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ। মারুফুল ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। কিন্তু যে দেশের জাতীয় দলে মানসম্মত কোনো ফুটবলারই নেই, সেই জাতীয় দল নিয়ে মারুফুল কী করবেন? ইউরোপের তিন কোচ ডি ক্রুইফ, ফাবিও লোপেজ ও টম সেইন্টফিটও পারেননি। কিন্তু মারুফুলকে আবারও পার্থক্যটা বুঝিয়ে দেওয়া হলো বেতন আটকে রেখে। মারুফুলের অধীনে তাও ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বেলজিয়ান সেইন্টফিটের সময় তো হারের লজ্জা মাথায় বইতে হয়েছে। ব্যর্থ হয়েও সেইন্টফিট ডলার পকেটে গুঁজে সসম্মানে দেশে ফিরে গেছেন। কিন্তু মারুফুল বেতনের জন্য ঘুরেছেন কর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে।

দারুণ ঝলমলে মারুফুলের ক্লাব কোচিং ক্যারিয়ার। মাত্র নয় বছরের মধ্যেই দেশ-বিদেশে দশবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি পাঁচবার রানার্সআপ হয়েছেন। ২০১৩ সালে শেখ রাসেলকে উপহার দিয়েছেন ট্রেবল শিরোপা। শেষ ট্রফিটা তো মাঝারি সারির আরামবাগের হয়ে রূপকথার জন্ম দিয়ে। একঝাঁক অখ্যাত তরুণকে নিয়ে দুই আবাহনী আর শেখ জামালকে হারিয়ে সেই রূপকথা। মারুফুলের কারিশমা এখানেই। দেশের অনেক ক্লাবই এটা বুঝতে পেরেছে; কিন্তু বাফুফেই কেবল বোঝেনি।

কেন বোঝেনি? উত্তরটা তো সহজ—মারুফুল যে একজন বাংলাদেশি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close