আন্তর্জাতিক ক্রিকেটক্রিকেট

অন্য বাংলাদেশ পুরনো বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০ হাজার রান তামিম ইকবালের। সঙ্গী হিসেবে কাল পেলেন সাকিব আল হাসানকে। তবে সে জন্য প্রথমজনের যেখানে লাগে এক দশক, পরেরজনের এক যুগ। এ নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তর কাল কেমন হাসতে হাসতেই না দিয়ে যান সাকিব, ‘একজন ওপেনার যেমন রান করবে, পাঁচ-ছয় নম্বরের ব্যাটসম্যান তা করতে পারবে না।’

সাকিব হাসেন, হেসে ওঠে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ। এর আগে মাঠের পারফরম্যান্সে ১১ ক্রিকেটসৈনিক মুখে হাসি ফুটিয়েছেন পুরো বাংলাদেশের। মাত্র কয়েক দিনে পুরো চিত্রটা কিভাবেই না পাল্টে গেল! দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের গুমোট হাওয়া কেটে গেল জয়ের ফুরফুরে বাতাসে। পর পর দুই ম্যাচে জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দাপুটে জয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবার যেন বসন্ত বাতাস। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পরাজয়ের চক্করের সঙ্গে যোগ হয় সিরিজ শেষে চন্দিকা হাতুরাসিংহের পদত্যাগ। লঙ্কান কোচ নিজ দেশের দায়িত্ব নিয়ে এলেন বাংলাদেশ সফরে। নানা রকম কথাবার্তা হচ্ছিল তাই। যদিও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন ক্রিকেটাররা। অন্যদের প্রতিও একই আহ্বান কাল জানিয়ে যান সাকিব, ‘হাতুরাসিংহের বিষয় আমরা মাথায় নিই না। চাইব, আপনারাও যেন মাথায় না নেন। তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’ পুরনো কোচের বিরুদ্ধে জয়ে বাড়তি আনন্দের কথাও মাথায় আনছেন না তিনি, ‘একটা জয় আমাদের কাছে শুধু জয়ই। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জেতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল ফাইনালে যাওয়ার জন্য। দুটি ম্যাচেই আমরা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে জিতলাম, অবশ্যই এটা আমাদের অনেক বড় আত্মবিশ্বাস দেবে পরের দুটি ম্যাচ জেতার জন্য।’

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সিরিজে দুর্বার। প্রতিপক্ষ তুলনামূলক দুর্বল জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কা হওয়ার কারণেই বাজে সময় উতরানো সহজ হয়েছে? সাকিব তা অস্বীকার করেননি। বরং এই টোটকায় যে কাজ হয়, ইতিহাস সেঁচে সেটি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘২০০৫-০৬ সালের দিকে আমরা ম্যাচ যখন জিততাম, তখন জিম্বাবুয়ের সঙ্গেই জিততাম। জেতার অভ্যাস ওখান থেকেই পরিণত হয়। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো করিনি বলে এমন একটি টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্স ভালো হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখন বেশির ভাগ দলই নিজেদের দেশে অনেক শক্তিশালী। আমরাও তাই। আশা করব, ভবিষ্যতে যেন এই অবস্থানটা পাকাপোক্ত করতে পারি এবং বাইরে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে পারি।’ এই সিরিজে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে নতুন ম্যানেজমেন্টেরও ভূমিকা দেখছেন সাকিব, ‘আমাদের পরিকল্পনা যাঁরা করেন তাঁদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। যেহেতু আমাদের কোচের পরিবর্তন এসেছে। তাঁর নতুন কিছু চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। বলব না যে, আগে আমরা স্বাধীনভাবে খেলতে পারতাম না। এখন আমরা স্বাধীনভাবে খেলার পাশাপাশি সিদ্ধান্তও নিতে পারি। এটি আমাদের এগিয়ে দিয়েছে।’

পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশকে আবার এগিয়ে দেওয়ায় সাকিবের অবদান সবচেয়ে বেশি। ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে পর পর দুটি খেলাতেই যে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন! ‘দলের জন্য অবদান রাখাটা সব সময়ই ভালো অনুভূতি। আমার ব্যাটিং-বোলিং সব বিভাগেই ভালো পারফরম্যান্স হচ্ছে। চেষ্টা থাকবে এটা যেন ধারাবাহিকভাবে করতে পারি’—এমন তৃপ্তির পাশাপাশি ৬৭ রানে আউট হয়ে সেঞ্চুরি মিসের একটু আক্ষেপও যেন সাকিবের কণ্ঠে, ‘পুরো ব্যাটিং করলে তো সেঞ্চুরি অবশ্যই হতো। সুযোগও ছিল। আর আউট হলে সবার মধ্যেই হতাশা কাজ করে, যে যত রানই করুক।’ সেঞ্চুরি না পেলেও বাংলাদেশে ওয়ানডের তিন নম্বর পজিশনের হাহাকার অবশেষে ঘোচার পথে তাঁর ব্যাটে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে কৃতিত্ব দেন তিনি, ‘আমাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর একটা প্রতিযোগিতা সব সময় কাজ করে। দলের মধ্যে কে বেশি রান করছে, কে বেশি উইকেট পাচ্ছে। এটা দলের মধ্যে সব সময়ই আমরা ইতিবাচকভাবে আলোচনা করি। আমার কাছে মনে হয়, প্রতিযোগিতাটা আরো ভালো হবে।’

ব্যাটিংয়ে তাঁর তামিমের সঙ্গে সে লড়াই অনেক দিনের। কাল সব ধরনের ফরম্যাট মিলে ১০ হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছার তৃপ্তি রয়েছে সাকিবের। আবার নিজেদের লড়াইয়ের গুরুত্বও ফুটে ওঠে তাঁর কণ্ঠে, ‘সবার তো সবার প্রতি অবশ্যই একটা প্রত্যাশা থাকে। নিজের সঙ্গে নিজের একটা চ্যালেঞ্জ থাকে। এমন প্রতিযোগিতা দলের জন্য অনেক ভালো। আমরা হয়তো তিন-চারজন আছি খুব কাছাকাছি রানের দিক থেকে। প্রতি ম্যাচেই আমাদের চিন্তা থাকে কার থেকে কে বেশি রান করবে। আমার কাছে মনে হয় আমাদের তিনজনের এই প্রতিযোগিতাটা খুব ভালো। এইটা যত বেশি দিন চলতে থাকবে, আমাদের দল তত ভালো খেলতে থাকবে।’

তাতে এই ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়টাও হয়তো সহজ হয়ে যাবে বাংলাদেশের জন্য!

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close