ক্রিকেটবিপিএল

এবারও সেই মুশফিককে নিয়ে হাহাকার

স্বস্তি এবং হাহাকার, রাজশাহী কিংস শিবিরের আশপাশে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে দুটোই। স্বস্তি তাদের অধিনায়ক ড্যারেন সামিকে নিয়ে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে মাত্র ১৪ বলে অপরাজিত ৪৭ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলার পরে তাঁকে নিয়ে দলসংশ্লিষ্ট কারো কারো আফসোসও বেড়েছে, ‘এসেই বল লেগে পাঁজরে চোট না পেলে আরো আগেই পারফরম করতেন সামি। ’

আর এই সামির নেতৃত্ব মেনে যিনি নির্দ্বিধায় খেলছেন রাজশাহীর হয়ে, হাহাকারটা সেই মুশফিকুর রহিমকে নিয়েই। তাঁর কাছে দলের প্রত্যাশা যে এখনো সেভাবে মেটাতে পারেননি। খুলনা টাইটানসের বিপক্ষে একটি ফিফটি করেছেন বটে, তবে সেটি দলকে জেতানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ ক্রিকেটারের কাছে নিজ নিজ দলের চাহিদা তো ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সই।

সেই চাহিদা কে কতটা পূরণ করতে পারছেন? ইনজুরি থেকে ফিরে সবে তামিম ইকবাল ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে তাঁর ৬৩ রানের ইনিংসও কুমিল্লার জয়রথ অব্যাহত রাখতে পারেনি। এই ম্যাচের আগে যদিও তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘নিজের কাছে নিজের প্রত্যাশাই তো পূরণ হচ্ছে না। ’ পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না সাকিব আল হাসানেরও।
৭ ম্যাচে ১০ উইকেট নিলেও যেহেতু তিনি অলরাউন্ডার, তাই ব্যাট হাতেও নিজেকে মেলে ধরার দাবি আছে তাঁর কাছে।

কিন্তু ৭ ম্যাচ খেলে ১৪.৫০ গড়ে করেছেন মোটে ৮৭ রান। সর্বোচ্চ ইনিংসটি ২৩ রানের, যে পারফরম্যান্সে অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের নামের প্রতি সুবিচারের লক্ষণ নেই। তাই বলে এমনও নয় যে শীর্ষ ক্রিকেটারদের মধ্যে কেউই নেই যাঁরা নিজ নিজ নামের ধার আর ভারের সঙ্গে মানানসই পারফরম করছেন না। চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) দলকে জেতানোর গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তাঁরা সফলও হচ্ছেন।

যেমন সফল হয়েছেন মাহমুদ উল্লাহ। খুলনা টাইটানসের অধিনায়ক পর পর দুই ম্যাচে ফিফটি করে দলকে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে তোলার ক্ষেত্রে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ী নেতৃত্বও এই ফ্র্যাঞ্চাইজির অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রভাবক। তাঁর তুলনায় আরো বেশি বৈচিত্র্যময় মাশরাফি বিন মর্তুজার ভূমিকা। আসরের শুরু থেকেই রংপুর রাইডার্স অধিনায়কের কার্যকরী বোলিংয়ের ঝলকটা দেখা যাচ্ছে। অবশ্য সেখানেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি দলের জন্য অবদান রাখার ক্ষেত্রটা বিস্তৃত করেছেন আরো।

কখনো কখনো রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে রান বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে ডাইভ দিতেও দেখা যাচ্ছে তাঁকে। সিলেট সিক্সার্সের বিপক্ষে যেমন প্রায় হারতে চলা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৭ রানের জয়ে অন্তত গোটাছয়েক রান বাঁচিয়েছেন ফিল্ডার মাশরাফি। একই ম্যাচে ডেথ ওভারে যখন বোলিং করতে এসেছেন, তখন ৭ উইকেট হাতে নিয়ে সিলেটের জেতার জন্য ২৪ বলে ৩৫ রানের সহজ সমীকরণ। ততক্ষণে সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ গড়ে ফেলা সাব্বির রহমান ও নাসির হোসেন মিলে জয়ের পথে বাকি পথ পাড়ি দেওয়াকে ‘ডালভাত’ বলেও মনে করাতে শুরু করে দিয়েছেন।

সেই সময়ে বোলিংয়ে এসে মাশরাফি মাত্র ২ রান দিয়ে সিলেটকে দেন বড় এক ধাক্কা। ধাক্কাই কারণ তাতে ওভারপিছু রানের লক্ষ্যমাত্রা হুট করে বেড়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের জন্য কাজটি কঠিন করে দেয়। এবং রংপুরের জেতার পথও খুলে দেয়। সেখানেই শেষ নয়, আরো বড় সংকটেও তাঁকে দলের ত্রাণকর্তা হতে দেখা গেছে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে। ১৭৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নামা দলের দুই বড় নাম ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও ক্রিস গেইল শুরু থেকে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে নেই বলে পাওয়ার প্লে’তে রানও উঠছিল না খুব। এই পর্যায়েই ম্যাককালাম বিদায় নিতেই সবাইকে চমকে দিয়ে মাশরাফি ব্যাটিংয়ে নেমে গেলেন তিন নম্বরে।

নেমে এমন ব্যাটিং করলেন যে তাঁর সামনে গেইলকেও ম্লান মনে হতে থাকল। তা নয়তো কী! গেইলের সঙ্গে ৪.২ ওভারে ৬০ রানের পার্টনারশিপে যে ৪২ রানই তাঁর ব্যাটে। বলও খেলেছেন মাত্র ১৭! প্রচলিত ভাবনার বাইরে গিয়ে তাঁর তিনে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্তেই ঘুরে যায় ম্যাচ। যা করতে নেমেছিলেন, করেছেনও তা-ই। ম্যাচের পরও আগে নামার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলছিলেন ভিন্ন কিছু করে দেখানোর চিন্তার কথা, ‘তিনে নেমেছিলাম স্লগ করার জন্য। তখন রানও হচ্ছিল না। আগের দুই ম্যাচেও তিনে নামার চিন্তা ছিল। কোনো কারণে হয়নি। এই ম্যাচে শিশির ছিল, স্পিনাররা টার্ন না পেলে ভালো খেলা সম্ভব বলে ভাবলাম চেষ্টা করে দেখি। কাজেও লেগে গেছে। আসলে কিছু সিদ্ধান্ত প্রচলিত ভাবনার বাইরে গিয়ে না নিলে এ ধরনের ম্যাচ জেতা কঠিন। ’

এবার ব্যাট হাতে ম্যাচ জিতিয়ে যাওয়া বোলার মাশরাফি ফিল্ডিংয়েও ঝাঁপাচ্ছেন এবং রানও বাঁচাচ্ছেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বিপিএলের এই আসরে দেশের শীর্ষ পাঁচ ক্রিকেটারের মধ্যে হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার ‘পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ’ও!

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close